বাংলাদেশ আজ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝে একটি নীরব চ্যালেঞ্জ আমাদের ভবিষ্যতের গতিকে মন্থর করে দিতে পারে—আর তা হলো শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষতা বা স্কিল গ্যাপ (Skill Gap)। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে এটা অন্তরায়।
আমি একজন শিক্ষা উদ্যোক্তা হিসেবে এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও প্রায়ই কর্মক্ষেত্রে নিজেদের প্রস্তুত মনে করতে পারে না। এর কারণ কী?
১. মূল সমস্যা: তাত্ত্বিক শিক্ষা বনাম ব্যবহারিক চাহিদা
আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, বহুলাংশে তত্ত্ব-কেন্দ্রিক (theory-focused)।
- পাঠ্যক্রম: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাঠ্যক্রমগুলি যুগোপযোগী নয় এবং বৈশ্বিক বা স্থানীয় শিল্পের বর্তমান চাহিদা প্রতিফলিত করে না।
- পরীক্ষা নির্ভরতা: মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়, যেখানে কর্মজীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সমস্যা-সমাধান (problem-solving), সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (critical thinking) এবং যোগাযোগ দক্ষতা (communication skills) উপেক্ষিত থাকে।
- শিল্পের সংযোগের অভাব: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পের মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব রয়েছে। ফলে গ্র্যাজুয়েটরা বুঝতে পারে না যে বাজারে ঠিক কোন ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন।
২. বর্তমান বাজারের চাহিদা এবং ‘স্কিল গ্যাপ’
কর্মসংস্থানের বাজারে এখন চিরাচরিত ডিগ্রিধারী কর্মীর চেয়ে দক্ষ কর্মী-র চাহিদা সবচেয়ে বেশি। যে খাতগুলো দ্রুত বাড়ছে, সেখানেই এই দক্ষতার অভাব প্রকট:
| দ্রুত বর্ধনশীল খাত | বর্তমানের মূল চাহিদা | প্রচলিত শিক্ষায় ঘাটতি |
| আইটি এবং সফটওয়্যার | ডেটা অ্যানালিটিক্স, এআই/মেশিন লার্নিং, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং | হাতে-কলমে প্রজেক্টের অভাব, পুরোনো প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে জোর |
| শিল্প-কারখানা ও উৎপাদন (Manufacturing) | উন্নতমানের কারিগরি জ্ঞান, রোবোটিক্স ও অটোমেশন দক্ষতা, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট | ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টার্নশিপের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত |
| মার্কেটিং ও কমার্স | ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স ব্যবস্থাপনা, গ্রাফিক্স ডিজাইন, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন | ব্যবহারিক কেস স্টাডি ও টুলসের ব্যবহার কম, শুধুমাত্র থিওরির উপর নির্ভরতা |
এই ‘স্কিল গ্যাপ’ এর ফলে একদিকে যেমন হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বেকার থাকছে, তেমনি অন্যদিকে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না, যা সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির গতিকে ব্যাহত করছে।
৩. এই সংকট উত্তরণের পথ কী? স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে কি করতে হবে?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি রূপান্তরের (Transformation) মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। এই রূপান্তর কেবল সরকারি উদ্যোগেই নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল হওয়া চাই।
- ১. পাঠ্যক্রমের আধুনিকীকরণ: শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে পাঠ্যক্রমকে নিয়মিত আপডেট করতে হবে। তত্ত্বের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান, প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষা (Project-Based Learning) এবং রিয়েল-লাইফ কেস স্টাডি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
- ২. সফট স্কিলস (Soft Skills) এর উপর জোর: যোগাযোগ, দলগত কাজ (teamwork), পেশাদারিত্ব এবং সময় ব্যবস্থাপনার মতো দক্ষতাগুলিকে নিয়মিত ক্লাস এবং অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
- ৩. বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ: প্রতিটি গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের বাধ্যতামূলক, কাঠামোগত ইন্টার্নশিপ (Structured Internship) চালু করা উচিত। এটি শিক্ষার্থীদের বাজার এবং কাজের পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেবে।
- ৪. শিক্ষক প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের অবশ্যই নতুন প্রযুক্তি এবং শিল্প-চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের জ্ঞান ও শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আধুনিক করতে হবে।
- ৫. ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল শিক্ষার প্রসার: শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষা নয়, বরং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) কে আরও আকর্ষণীয় ও মানসম্পন্ন করে তুলতে হবে, যাতে সমাজের একটি বড় অংশ সরাসরি কর্মমুখী দক্ষতায় প্রবেশ করতে পারে।
বাংলাদেশ একটি তরুণ রাষ্ট্র, যেখানে জনসংখ্যার অধিকাংশই কর্মক্ষম। এই তারুণ্যের শক্তিকে সঠিক পথে চালিত করার জন্য শিক্ষাই হলো প্রধান হাতিয়ার। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বাজারের চাহিদার এই সমন্বয় সাধন করতে পারলেই আমরা একটি স্মার্ট বাংলাদেশ এবং একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরির স্বপ্ন পূরণ করতে পারব।
ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে ক্লাসরুমে নয়, বরং ব্যবহারিক শিক্ষালয়ে।